১। অতীতে বিভিন্ন সময় দেশের চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন ঘটনায় মানুষ যখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল তখনই র্যাব সেই সকল ঘটনার অনুঘটকদের গ্রেফতার করে জনমনে স্বস্থির সঞ্চার করেছে। সাম্প্রতিককালে ঢাকার মগবাজারে সোনালীবাগে একটি বাড়ীতে ঢুকে গুলি করে ভাই-বোনসহ তিনজনকে হত্যা ও অপর একজনকে মারাত্নক আহত করার নৃশংস ঘটনা মানুষের অন্তরাত্মাকে কাপিয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনার বিভৎসতা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। গত ২৮ আগষ্ট ২০১৪ তারিখ রাত আনুমানিক ০৮.০০ ঘটিকার সময় মগবাজার সোনালীবাগে চাঁন বেকারির গলির একটি বাড়ীতে ঢুকে ০৮ জন দুষ্কৃতিকারী প্রকাশ্যে নির্মমভাবে গুলি করে ০৩ জনকে হত্যা ও ০১ জনকে গুলিবিদ্ধ করে গুরুতর আহত করে। নিহত ০৩ জন হলেন (১) রানু আক্তার (৩০), (২) বিলস্নাল (২৮), (৩) মুন্না (২৫) এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে নিহত রানুর ভাই হৃদয় (২২)। ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ ঢাকা মহানগর পুলিশের ও র্যাবের উদ্ধর্তন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। নৃশংস এই ঘটনায় অত্র এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে, সকলে ঘটনার সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য জোরালো দাবী জানায়। নৃশংস ট্রিপল মার্ডারের সাথে জড়িতদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সরকারের বিভিন্ন আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বাত্নকভাবে চেষ্টা চালাতে থাকে। প্রাথমিকভাবে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে প্রদান করা হয়। এই প্রেক্ষিতে নিহত রানুর ভাই কালাচান বাদী হয়ে রমনা থানায় স্থানীয় সন্ত্রাসী কালাবাবুসহ ১৫ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এমতাবস্থায় র্যাব হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য তৎপর হয়।
২। নির্মম এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে রেলওয়ের জমি দখল। সোনালীবাগ চান বেকারী গলির মসজিদের পার্শ্বে রেলওয়ের সোয়া এক কাঠা খাস জমি আছে তার দখল নিয়েই হত্যাকান্ডটি সংগঠিত হয় বলে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় এই জমিটি এক সময় দখলে ছিলো শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ঘনিষ্ট সহযোগী সন্ত্রাসী রনির। পরবর্তীতে ২ বছর আগে রনি গ্রেফতার হওয়ার পর তার সহযোগী কালাবাবু, সিয়াম প্রমুখরা এটির দখলে নিয়ে ভাড়ার টাকা তোলা শুরু করে। এরপর রনি জামিনে বের হয়ে দুবাই পালিয়ে গেলে জমিটি সম্পূর্নভাবে কালাবাবুরা ভোগ করতে থাকে। এর মধ্যে টিএন্ডটি কলোনীতে আনসার হত্যা ও মগবাজারে ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মাহবুবুর রহমান রানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় কালাবাবু, সিয়ামসহ তাদের দল গা ঢাকা দিলে ঐ জমির অর্ধেক অংশ কালাবাবুর মামাতো ভাই রনি নিহত বৃষ্টির ভাই কালাচাঁনের সহযোগীতায় দখল করে নিয়ে নেয় এবং সেখানে ০৪ টি টিনসেড ঘর দ্রুত তুলে ফেলে। সম্প্রতি রনির কাছ থেকে কালাচাঁনের বোন বৃষ্টি (নিহত) ঐ টিনসেড ঘরের ০২ টি কিনে নেয়। এতে রনি, বৃষ্টি ও কালাচাঁনের উপর ক্ষিপ্ত হয় কালাবাবু। এই প্রেক্ষিতে কয়েক দফা বৃষ্টির কাছে ২ লক্ষ টাকা চাঁদাও দাবী করে সে। কিন্তুু বৃষ্টি ও তার ভাই কালাচাঁন কোন টাকা দিতে রাজী না হওয়ায় তাদেরকে হত্যার পরিকল্পনা করে কালাবাবু। এই প্রেক্ষিতে কালাবাবু তার সহযোগী সিয়ামসহ অন্যান্যদের নিয়ে গত ২৮ আগষ্ট রাত আনুমানিক ০৮.০০ ঘটিকার সময় চাঁনবেকারির গলিতে বাসায় ঢুকে বৃষ্টিসহ ০৩ জনকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে এবং বৃষ্টির ভাই হৃদয়কে গুলিবিদ্ধ করে পালিয়ে যায়। নৃশংস হত্যাকান্ডটি সম্পূর্ন পরিকল্পিত বিধায় হত্যাকারীরা হত্যার পর কৌশলে বিভিন্ন স্থানে আত্নগোপন করে। এই সকল বিষয়াদি বিবেচনায় রেখেই র্যাব গোয়েন্দা দল নির্মম এই হত্যাকান্ডের মূল রহস্য উদঘাটনের নিমিত্তে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।
৩। অতপর ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম সমাপনান্তে র্যাব-৩ এর গোয়েন্দা দল প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হন যে, নির্মম ঘটনাটির সাথে শাহ আলম @ কালাবাবু ও জিসান গ্রুপের অন্যতম সদস্য মোঃ সাইফুলাহ @ সিয়াম ও আল আমিন সরাসরি জড়িত। এই প্রেক্ষিতে কালাবাবু ও সিয়াম ও আলা আমিনকে গ্রেফতারের সর্বাত্নক প্রচেষ্টা চালানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব-৩, ঢাকা গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারে আল আমিন মুন্সীগঞ্জ এলাকায় আত্মগোপন করে আছে। উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-৩, ঢাকা এর একটি আভিযানিক দল অভিযান পরিচালনা করে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখ রাত ০৯০০ ঘটিকার সময় কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী (১) আল আমিন (২৫) কে মুন্সীগঞ্জ হতে আটক করে। আটককৃত আসামীকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তার দেওয়া তথ্যমতে কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারীদের অদ্য ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখ রাত ১২২৫ ঘটিকায় (২) মোঃ সাইফুললাহ সিয়াম (২৪) এবং (৩) মোঃ রমজান আলী (২০)দেরকে রাজধানী ঢাকার মতিঝিল টিএন্ডটি কলোনীর বসত্মীর একটি ঘর থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ২টি পিসত্মল, ৬ রাউন্ড গুলিসহ আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী অদ্য ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখ রাত ১২৫০ ঘটিকায় (৪) মোঃ রম্নবেল মিয়া@সানি (২৫), (৫) মোঃ মারম্নফ হোসেন (২৬, (৬) মোঃ শাফিন লস্কর (২৫) দেরকে একই বসিত্মর আরেকটি ঘর হতে ৩টি চাপাতিসহ আটক করা হয়।
৪। আসামীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, সিয়াম এই হত্যাকান্ডে পর আরো একটি অস্ত্র কেনার পরিকল্পনা করছিল। এই অস্ত্রের সাহায্যে অত্র টিএন্ডটি কলোনী এলাকায় নিজের আধিপত্য বিসত্মারের লÿÿ্য কালা চান, শোভন, মোশাররফসহ আরো দুই একজনকে হত্যার পরিকল্পনা করছিল। মগবাজার সোনালীবাগের চান বেকারীর গলির শেষ মাথায় মসজিদের পার্শ্বের রেলওয়ের উক্ত সোয়া এক কাঠা জমির দখল ও চাঁদাবাজির কারনেই কালাবাবু, সিয়াম প্রমুখরা উক্ত নির্মম হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে। ঘটনার দিন আনুমানিক ১৪০০ ঘটিকার দিকে রামপুরা ব্রিজের উপর সিয়াম ও কালাবাবু দেখা করে এবং কালাচানসহ তার বোন বৃষ্টিকে ফাইনাল করার অর্থ্যাৎ হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনামতে সিয়াম সন্ধ্যা ১৯০০ ঘটিকার দিকে একটি ব্যাগে করে ০৩ টি চাপাতিসহ রামপুরা দিয়ে হাতিরঝিলে ঢুকে ১ম পাবলিক পারাপারের ব্রিজের গোড়ায় চলে আসে। এই সময় কালাবাবুও ঐখানে ০২টি পিসত্মলসহ আসে। এদিকে কিলিং মিশনে অংশগ্রহনকারী অন্যান্য সদস্য রমজান, রম্নবেল, শাফিন ও আল আমিন বনশ্রীর মাথায় এসে যোগাযোগ করলে সিয়াম ও কালাবাবু হাতিরঝিল থেকে বনশ্রীর মুখে চলে আসে। ঐখানে সবাই মিলিত হয়। কালাবাবু তখন সিয়ামকে ও রমজানকে দুইটি রিভলবার দেয় এবং বাসে করে সবাই সোনালীবাগ মোড়ে রাত আনুমানিক ০৭.৪৫ ঘটিকার দিকে নামে। ঐ সময় কালাবাবুর মুখে একটি ডাষ্ট মাক্স এবং সিয়ামের মাথায় একটি ক্যাপ পরা ছিল। সোনালীবাগ মোড় হতে চাঁনবেকারির গলিতে প্রবেশের মুখে মারুফ এসে তাদের সাথে যোগ দেয়। এই সময় সিয়াম তার ব্যাগ থেকে চাপাতি ও ছোরা বের করে সকলকে দেয়। এরপর তারা ২ জন/১ জন করে গলিতে প্রবেশ করে এবং গলির শেষ মাথার মসজিদের পার্শ্বে উক্ত টিন সেডের সামনে যায়। টিনসেডের সামনে গিয়ে তারা টিনসেডের খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। এই সময় টিনসেডের ভিতরে বিলাল, মুন্না এবং হৃদয় বসে ছিলো।
ভেতরে প্রবেশ করে ঘাতকরা ঐ ৩ জনকে যা কিছু আছে তা দিয়ে দিতে বলে তাদের কাছ থেকে ৮/১০ বোতল ফেন্সিডিল ও ১৫/১৬ পিছ ইয়াবা পায় এবং সিয়াম ঐগুলো তখন তার ঐ চাপাতি ও ছোরা রাখার ব্যাগে ভরে ফেলে। ইতিমধ্যে কালাবাবু এলোপাতাড়ি গুলি করা শুরু করলে তাদের বাম পার্শ্বে দাঁড়ানো বিললাল গুলিবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো অবস্থা থেকে মেঝেতে পড়ে যায়। তখন সিয়াম এগিয়ে গিয়ে তাদের ডান পার্শ্বে দাঁড়ানো মুন্নার পেটে রিভলবারের নল ঠেকিয়ে গুলি করলে মুন্নাও মেঝেতে পড়ে যায়। অতপরঃ সিয়াম, কালাবাবু ও রমজান পুনরায় ৫/৬ রাউন্ড এলোপাতাড়ি গুলি করলে বিছানায় বসা হৃদয় গুলিবিদ্ধ হয়ে বিছানার উপর শুয়ে পড়ে। তখন সবাই দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে ডান দিকের গলিতে বৃষ্টির বাসার নিচে চলে আসে। বাকীদের নীচে থাকতে বলে সিয়াম, কালাবাবু ও রমজান উপরে দোতলায় বৃষ্টির বাসায় উঠে যায়। বৃষ্টির বাসার গিয়ে কলিংবেল চাপলে বৃষ্টি নিজেই দরজা খুলে। এ সময় কালাবাবুকে দেখে সে খুব উত্তেজিত হয়ে যায়। তখন কালা বাবুর সাথে বৃষ্টির উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। ঠিক তখনই সিয়াম ও কালাবাবু বৃষ্টিকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করে। বৃষ্টি গুলিবিদ্ধ হয়ে ভেতরের দিকে গিয়ে পড়ে যায়, তখন ঘাতকরা বাহির থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে অতি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে গলির মুখে চলে আসে এবং পালিয়ে আত্নগোপন করে।
৫। কিলিং মিশনে অংশগ্রহনকারী ঘাতকদের মধ্যে সিয়াম শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান বাহিনীর অন্যতম সদস্য। সে এবং কালাবাবু শৈশবকাল থেকেই ঘনিষ্ট বন্ধু। সে গত ২০০৫ সালে জিসানের নির্দেশে ইস্কাটনে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গুলি বর্ষন করে। এরপর ২০০৭ সালে পল্টনে অটো মিউজিয়ামেও জিসানে নির্দেশে চাঁদাবাজির জন্য গোলাগুলি করলে একজন নিরাপত্তা কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়। একই বছর ফকিরাপুলে ঈগল কাউন্টার ও যুগান্তর পত্রিকার অফিসের সামনেও সে গোলাগুলি করে। ২০০৮ সালে মগবাজারের আলোচিত অপু মার্ডার মামলারও সে অন্যতম আসামী। এছাড়াও সে ২০১২ সালে কুষ্টিয়ায় সালমা নামের এক মেয়েকে জোরপূর্বক ধর্ষন করে। অপর ঘাতক শাফিন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান গ্রুপের অপর সদস্য। সে মাত্র গত তিন মাস পূর্বে জেল থেকে জামিনে বের হয়ে আসে। শাফিন ইতিপূর্বে আরো দুইটি হত্যা মামলায় দুইবার জেলে ছিলো। সে ২০০৯ সালে বাড্ডায় আলোচিত শিল্পপতি মার্ডার অর্থ্যাৎ তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেনের শ্বশুর হত্যা মামলার সাজা প্রাপ্ত আসামী। উলেলখ্য, তোবা গ্রুপের মালিকের নিকট শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী করলে তা দিতে অস্বীকার করায় তারা হত্যাকান্ডটি ঘটায়। ঐ মামলায় সে ২ বছর জেলে ছিলো। এরপর ২০১৩ সালে মালিবাগ সুপার মার্কেটের মালিকের ছেলে হত্যা মামলায়ও সে ৭ মাস জেল খাটে। এছাড়াও মাদক মামলায় শাফিন ২০০৭ সালে জেলে ছিলো। ঘাতক আল আমিনের বিরুদ্ধে রমনা ও রামপুরা থানায় ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মারামারি ও মাদকের মোট ০৫ টি মামলা রয়েছে। সে ২০০২ সালে রমনা থানায় একটি মারামারি মামলার ১ বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামী। ঘাতক রুবেলের বিরুদ্ধে সবুজবাগ থানায় একাধিক মারামারির মামলা আছে। উক্ত হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত অপর এক সদস্য বর্তমানে পলাতক আছে। এক্ষেত্রে র্যাবের পর্যায়ক্রমিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং অতি শীঘ্রই উক্ত পলাতক ঘাতককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে বলে র্যাব আশাবাদী।